অভিন্ন জীবনের মিথ

- অমৃতা


সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবন আর ব্যক্তিগত থাকে না, তা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। আজকের সামাজিক বাস্তবতায় আমরা শুধু বাঁচি না, দেখাই যে আমরা বাঁচছি। এই দেখানোর তাগিদ থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় এক ধরনের অভিন্নতা, যেখানে জীবনযাপনের ভাষা প্রায় সবার এক হয়ে যায়।

ডিজিটাল পরিসরে প্রভাবশালী জীবনধারার যে প্রতিরূপ তৈরি হয়, তা মূলত সম্ভাবনার নয়, বরং প্রত্যাশার মানচিত্র। কী পরতে হবে, কোথায় যেতে হবে, কীভাবে বিশ্রাম নিতে হবে—সবই নির্ধারিত হয়ে যায়। অথচ এই নির্ধারণের সময় খুব কমই বিবেচনায় আসে ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক বাস্তবতা, সামাজিক পটভূমি, বা মানসিক সক্ষমতা। ফলে জীবন হয়ে ওঠে একটি লক্ষ্যভিত্তিক প্রকল্প, যেখানে প্রতিটি পছন্দকে প্রমাণ করতে হয়।

এই অভিন্নতার সবচেয়ে সূক্ষ্ম প্রভাব পড়ে ব্যক্তিসত্তার ওপর। আলাদা হওয়া আর স্বাভাবিক থাকে না; বরং তা হয়ে দাঁড়ায় ব্যতিক্রম, কখনো কখনো ব্যর্থতার লক্ষণ। অনেকেই তাই নিজের প্রয়োজনকে সরিয়ে রেখে এমন জীবনযাপন বেছে নেন, যা দেখাতে গ্রহণযোগ্য, যদিও তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। ঋণ, অতিরিক্ত কাজের চাপ, এবং নীরব মানসিক ক্লান্তি—এই তিনটি আজকের “সফল” জীবনের অনুচ্চারিত সঙ্গী।

সমস্যাটি অনুকরণে নয়, সমস্যাটি তার অস্বীকারে। আমরা স্বীকার করতে চাই না যে একই জীবন সবার জন্য সমানভাবে সম্ভব নয়। সমতার নামে আমরা একরকম আকাঙ্ক্ষা তৈরি করছি, অথচ বাস্তবতা ক্রমশ অসম হয়ে উঠছে। এই দ্বন্দ্ব থেকেই জন্ম নেয় হতাশা, আত্ম-সন্দেহ, এবং এক ধরনের স্থায়ী অসন্তোষ, যা ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বলে ভুল ব্যাখ্যা করা হয়।

অথচ জীবন কখনোই একমাত্রিক ছিল না। তার সৌন্দর্য ছিল ভিন্নতায়, সীমায়, অসম্পূর্ণতায়। আজ সেই সীমাগুলোকেই ঢেকে ফেলার চেষ্টা চলছে—ফিল্টার দিয়ে, ভাষা দিয়ে, প্রদর্শন দিয়ে। কিন্তু যে জীবন নিজের বাস্তবতার সঙ্গে সংলাপে থাকে না, তা শেষ পর্যন্ত টেকেও না।

সম্ভবত এখন সবচেয়ে জরুরি প্রতিরোধটি খুব নীরব—নিজের মতো করে বাঁচার সাহস। সেই সাহস, যা চোখে পড়ে না, কিন্তু জীবনের ভারসাম্য রক্ষা করে।

Comments

Popular Posts