বনফুলের মতো দৃশ্য, বজ্রপাতের মতো প্রশ্ন: সত্যজিৎ রায়ের সিনেমার জাদু

- অমৃতা


“অপুর বুকে মায়ের জন্য হাহাকার, আর সেই মুহূর্তে দূরে শঙ্খ বাজছে।”

একটা সিনেমার দৃশ্য কি সত্যিই সময়কে অতিক্রম করতে পারে? আমাদের চারপাশের সমাজ, রাজনীতি, প্রেম, শোক সব কিছুকে কি একেকটা দৃশ্যের ভেতর ধরে রাখা সম্ভব? সত্যজিৎ রায় প্রমাণ করেছেন, সম্ভব তো বটেই, বরং সেটাই শিল্পের একমাত্র সত্য।

“দেখতে পাচ্ছিস অপু, কাশবন কেমন দুলছে?” — ‘পথের পাঁচালী’-র সেই দৃশ্য, যেখানে ছোট্ট অপু আর দূর্গা দৌড়চ্ছে রেলের পেছনে। শুধু একটা দৃশ্য নয়, এ যেন গোটা বাংলার শৈশব। রেললাইনটা আজও দৌড়ে যাচ্ছে, শুধু অপু আর দূর্গার জায়গায় বসেছে নতুন প্রজন্ম। আজও আমাদের জীবনের শূন্যতার দিকে ছুটে চলা।

সত্যজিৎ শুধু সিনেমা বানাননি, তিনি দর্শকের চোখে প্রশ্ন ঢুকিয়েছেন। কেন এক মা সন্তানের জন্য ক্ষুধার্ত অবস্থায় ভাত ফোটায়, অথচ সমাজ নির্বিকার? কেন শহুরে ভদ্রলোকের মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকে বাঘের মতো হিংস্রতা? ‘জনঅরণ্য’-তে যখন সোমনাথ বলে — “চেষ্টা করেছি স্যার, চেষ্টা করেছি…” — সেটা কি কেবল এক চরিত্রের ব্যর্থতা? না কি আমাদের সমগ্র যুব সমাজের প্রতিফলন, যারা চাকরি নামের রেলের কামরায় উঠতেই পারে না?

এখানেই সত্যজিতের আলাদা রকম জাদু। তিনি গল্প বলেননি, তিনি আয়না ধরেছেন। একবার ‘অশনি সংকেত’-এ সেই আয়নায় দেখা গেল দুর্ভিক্ষে মরে যাওয়া চাষির মুখ; আবার ‘দেবী চৌধুরাণীতে’-তে গাইতে শোনা গেল — “দুর্গম গিরি, কান্তার মরু, দুস্তর পারাবার হে…।” শুধু শিশুদের গান নয়, এ এক রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টো। সেই শাসকের মুখোশ কি তখনকার? না কি আজও আমাদের চারপাশে?

সত্যজিৎকে আলাদা করে তোলে তাঁর নির্লিপ্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। অন্যদিকে তখনকার বলিউড গাইছিল “মেরে পাস মা হ্যায়”-অতিরঞ্জিত নাটকীয়তায় ভরা সংলাপ, চকচকে নাচগান। আর বাংলার অন্ধকার ঘরে সত্যজিৎ তুললেন এক অস্থির প্রশ্ন: “মা কি শুধুই বলার বস্তু, না কি তার পেটের খিদেরও দাম আছে?” এভাবে তিনি জনপ্রিয় সিনেমার ঝলকানিকে টপকে উঠে আসেন ভয়ংকর বাস্তবতায়।

তাঁর ছবির সংলাপগুলোও সময়ের বাইরে নয়। ‘অপুর সংসার’-এ অপুর কান্না — “আমি তোকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না।” — এ যেন প্রতিটি অভিভাবকহারা সন্তানের আর্তনাদ। আজকের শরণার্থী শিশু, কিংবা রেলস্টেশনে হারিয়ে যাওয়া বাচ্চাটিও একই কথাই বলতে পারত। সিনেমা এখানে আর বিনোদন নয়, এক নথি।

কিন্তু রায়ের সিনেমাকে কেবল রাজনীতি বা দারিদ্র্যের গণ্ডিতে আটকে রাখলে ভুল হবে। তিনি একই সঙ্গে খুঁজেছেন সৌন্দর্য। ‘চারুলতা’-য় দোলনায় দোল খেতে খেতে চারুর চোখে ধরা পড়া একাকীত্ব — এমন দৃশ্য কি কেবল নারীর বন্দিত্ব? না কি আজও আমাদের শহুরে ফ্ল্যাটে বসে থাকা হাজারো চারুলতার আর্তনাদ? এ এক নিঃশব্দ বিস্ফোরণ, যেটা দর্শককে ভাবতে বাধ্য করে।

তাঁর সিনেমার সঙ্গীত, আলোকসজ্জা, ক্যামেরার ভাষা সবই গল্পের অংশ। ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর ভূতের নাচ কি নিছক কল্পনা? নাকি সেটাই আসল বাস্তব-যেখানে ক্ষমতা মানেই ভূতের দাপট? আজকের রাজনৈতিক রাস্তায় দাঁড়ালে হয়তো বোঝা যায়, ভূতেরাও আসলে খুব চেনা।

একবার ভাবুন, যদি সত্যজিৎ আজ বেঁচে থাকতেন — তিনি কি মোবাইলের আলোতে ডুবে থাকা আমাদের শহরকে দেখিয়ে দিতেন অন্য চোখে? হয়তো তাঁর ক্যামেরা ধরত সেই মুহূর্ত, যখন এক ডেলিভারি বয় বৃষ্টির রাতে প্লাস্টিক চাপিয়ে খাবার পৌঁছে দিচ্ছে। হয়তো তিনি দেখাতেন, কীভাবে এক তরুণীর ইনবক্স ভরে যাচ্ছে নিঃশব্দ হিংস্রতায়।

তাঁর সিনেমা শেখায় — 'সময় বদলায়, কিন্তু প্রশ্ন বদলায় না।"

শেষ পর্যন্ত সত্যজিৎ রায় আমাদের শিখিয়ে গেছেন একটাই কথা: সিনেমা মানে শুধু ছবি নয়, এটা আমাদের আত্মার আয়না। আর আয়নায় তাকালে সব সময় সুন্দর দেখা যায় না, অনেক সময় দেখা যায়-আমাদের নিজেদের কুৎসিত মুখ।

তাহলেই কি সত্যজিতের ছবিকে আমরা ভয় পাই? নাকি আমরা আজও তাঁর আয়নায় নিজেদের মুখোমুখি হতে চাই না?



Comments