গোদার - জাম্প কাট - আমরা

- অনুরণ


"আজকে দাদা যাবার আগে

বল্ যা মোর চিত্তে লাগে

নাই বা তাহার অর্থ হোক

নাই বা বুঝুক বেবাক লোক

আপনাকে আজ আপন হাতে

ভাসিয়ে দিলাম খেয়াল স্রোতে..."


একানব্বই বছর বয়সে ফ্রান্সে জঁ-লুক গোদার মারা গেলে কদমতলায় সতেরো বছর বয়সী আমার কী যায় আসে? আমি তো বহুদিন আগেই 'দর্শক' থেকে 'কনজিউমার' হয়ে গেছি। গোদার আমার সাথে দেখা হলে এমনিতেই বিরক্তমুখে একটা জাম্বো সিগার ধরিয়ে সরে পড়তেন। গোদাররা সবসময়েই মিডিওক্রিটি আর মিডিওক্রিটির শিকার ও পণ্যদের পাশ থেকে সরে পড়েন ঠোঁটে বেপরোয়া একটা জাম্বো সিগার ধরিয়ে।

গোদার! 'সিনেমা' নামক ফর্মটাকে নিয়ে অনায়াসে খেলা করা গোদার! যারা খুব দ্বিধাহীনভাবে ভালোবাসতে পারে, তারা ভালোবাসাকে নিয়ে, তার অতুল সম্ভাবনা নিয়ে যেভাবে খেলে, বারবার তাকে ছুঁড়ে দেয় ওপরে, তারপর ভাঙার আগের মুহূর্তে ধরে নেয় ঠিক; বারবার তাকে বেঁকিয়ে টেঁড়িয়ে ওলোটপালট করে নতুন নতুন করে দেখে প্রতিদিন, গোদারের কাছে সিনেমা সেইটা। আমাদের চোখ তো সবার প্রথমেই ফর্মের কাছে, অতীত অভিজ্ঞতার কাছে এবং সীমাবদ্ধতার কাছে আপোষ করে তারপর দেখতে বসে, তাই গোদারের ছবি, তার ছবির পরতে পরতে প্রকাশিত তীব্র বিদ্রোহ, ফর্মের প্রতি তীক্ষ্ণ শ্লেষ আমাদের সবকিছু ঘেঁটে দেয়। কিছু মানুষ থাকে ঘেঁটে দেওয়ার জন্য, কিছু মানুষ সমাজের টেনে রাখা স্টেবিলিটি আর পলিটিক্যাল কারেক্টনেসের ঘোমটাটা খুলে আসল খ্যামটানাচনটা দেখে ফেলে। তারপর নিখুঁত মস্তানিতে সরে যায় ঠোঁটে একটা সিগার নিয়ে।

এই যে 'লে মেপ্রিস' এ হলিউড স্টুডিও কালচারকে নিয়ে, 'সেক্স সিম্বল'-এর ব্যবসা নিয়ে, সিনেমাকে 'পণ্য' করা নিয়ে এত সহজ অথচ কী গভীর একটা মজা করলেন গোদার, আমরা তাতে কিছু শিখলাম কী? একটা মানুষ উনিশশো ষাটের সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের সমস্ত দ্বিধা, আমাদের বুকের ওপর চেপে বসা সমস্ত শেকলের দাগ, আমাদের ইন্দ্রিয়ের সমস্ত চিৎকার, আমাদের ভেতর ভেতর ঠান্ডা করে রাখা সমস্ত বিস্ফোরণ ও চুম্বনেচ্ছা নিয়ে এক একটা সিনেমা বানিয়ে গেছেন আর এত বছর পরেও আমরা ঠিক একই জাঁতাকলে। গোদার তাই পঞ্চাশ বছর আগেও আমাদের না হওয়া সমস্ত আইনভঙ্গ, আমাদের চিৎকার করতে না পারা সমস্ত হাহাকার, আমাদের ফেটে পড়তে না পারা সমস্ত অসহায়তা। গোদার আমাদের না ধরানো সমস্ত সিগার।

গোদারও এমন সময়ে মারা গেলেন যেটা পৃথিবীতে ক্যাপিটালিজমের স্বর্ণযুগ। পোস্ট-প্যানডেমিক পৃথিবীতে সবকিছু পুঁজির পোষ্য। আমাদের টুকটাক যা রাগ, হতাশা, হাহাকার জন্মায় সেসব ঢেকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ উত্তেজক সিনেমা ও যথেষ্ট পরিমাণ বিতর্ক-নিউজ-সেক্স-কেচ্ছা-হুজুগ আমাদের চোখের সামনে মজুত।

সুতরাং এমন একটা সময়ে গোদারের মতো একটা মানুষ, একটা প্রচলিত ফর্মের প্রতি, ক্যাপিটালিজম আর স্থিতাবস্থার প্রতি তীব্র শ্লেষযুক্ত মানুষ, একটা 'বেয়াড়া সৃষ্টিছাড়া নিয়মহারা হিসেবহীন' মানুষ যে মারা যাবেন, সেটাই স্বাভাবিক। মারা যাবেন অর্থাৎ সহজ মস্তানিতে একটু দূরে সরে গিয়ে সিগার ধরাবেন একটা।

খুব কম মানুষের ক্ষেত্রেই "তুমি গেছো, স্পর্ধা গেছে, বিনয় এসেছে" কথাটা প্রযোজ্য হয়। গোদার সেই মানুষ।




Comments