চিরন্তন রাজনৈতিক রূপকঃ হীরক রাজার দেশে
- সমৃদ্ধি
সত্যজিৎ রায়ের ১৯৮০ সালের চলচ্চিত্র "হীরক রাজার দেশে", আজ ২০২৫ সালে এসেও আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে যে আজ এই দেশের রাজনৈতিক দলের কিছু কিছু বাণী বা কাজ অবিকল হীরক রাজার সাথে মিলে যায়। যেমন হীরক রাজার এক বাণীতে তিনি বলেছিলেন "লেখা পড়া করে যে, অনাহারে মরে সে"। আজ হয়তো তাই হচ্ছে, আমাদের সরকার সিলেবাস থেকে কত বিশেষ তথ্য বাদ দিয়ে দিয়েছে তার মধ্যে এক হলো মুঘল সাম্রাজ্য। যে সাম্রাজ্য এই বর্তমান দিনে আমাদের শিল্প-কলা, গান, তথ্য, বিদ্যা দিয়েছে তাদের ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে বাচ্চারা তাজ মহল, আগ্রা ফোর্ট, মুঘল মিনিয়েচার, এ ব্যাপারে হয়তো কিছুই জানলো না। এবং এই যে চারিদিকে এতো ছাত্র ছাত্রীদের স্বপ্ন ডাক্তার, শিক্ষক, ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার, তাদের কোনো চাকরি নেই। তারা প্রতিবাদ করে যায় দিনের পর দিন। তাই হয়তো হীরক রাজা ঠিকই বলেছিল।
রাজার দরবারে যে-ই একটু ভিন্ন মত পোষণ করে, তাকেই ধরে নিয়ে যাওয়া হতো রাজার বিজ্ঞানীর বানানো পরীক্ষাগারে। সেখানে চলত মগজ ধোলাই — এমন এক প্রক্রিয়া, যা মানুষের যুক্তি–বুদ্ধি সম্পূর্ণ নিস্তেজ করে দেয়। তারা আর নিজে কিছু ভাবতে পারে না, শুধু মুখস্থ করা বুলি তোতাপাখির মতো আওড়াতে থাকতো। এ যেন হুবহু সেই শাখাগুলোর মতো, যেখানে সদস্যদের ‘প্রশিক্ষণ’ দিয়ে এক নির্দিষ্ট মতাদর্শের প্রতি সম্পূর্ণ ভক্তি জাগিয়ে তোলা হতো । রাজা সবচেয়ে ভয় পেতো শিক্ষার বিপ্লবী শক্তিকে।
কিছু মিল পাচ্ছেন আজকের ভারতের সাথে?
হীরক রাজার দেশে, সত্যজিৎ রায় একবারও ছবির বার্তাকে শিশুদের উপযোগী করার জন্য কৃত্রিমভাবে মিষ্টি করে দেননি। বরং, তিনি এই সুযোগটাকেই সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যবহার করেছিলেন শিশুদের কাছে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দিতে — যে লড়াই করার মতো একটাই যুদ্ধ আছে, আর তা হলো অন্যায়–অত্যাচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এই যুদ্ধ রক্তহীন, তবুও এর লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রুকে সিংহাসনচ্যুত করা। ছবিটির সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল এই যে, এটি তার প্রধান দর্শক—শিশুদের—প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে কোনো অংশে কম বুদ্ধিমান বলে ভাবেনি। বরং তাদের শেখানো হয়েছিল সঠিক আর ভুলের পার্থক্য, আর প্রয়োজনে বিদ্রোহে উঠতে অনুপ্রাণিত করা হয়েছিল।
ছবিতে হীরক রাজা ছিল এক সর্বগ্রাসী শাসক, যার হাতে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল। আজকের ভারতেও শাসক দলের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ শোনা যায় — যে সব ক্ষমতা এক কেন্দ্রে জমা হচ্ছে, আর ভিন্নমতকে দমন করা হচ্ছে। যোগ্য লোকেদের চাকরি ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ছবিতে রাজা সবচেয়ে ভয় পেত শিক্ষাকে, কারণ শিক্ষা মানুষকে বিদ্রোহী করে তুলতে পারে।
আজকের ভারতে পাঠ্যপুস্তকের পরিবর্তন, ইতিহাসের বিকৃতি, আর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বশাসনে হস্তক্ষেপ—সবই যেন শিক্ষাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা।
হীরক রাজ্যের মানুষ ছিল শোষিত, অনাহারে, অথচ রাজা বিলাসিতায় মত্ত ছিল। আজও দেখা যায়, সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছে, অথচ রাজনৈতিক নেতারা অঢেল প্রিভিলেজ আর আরামে ডুবে আছেন।
হীরক রাজার দেশে কেবল শিশুদের কল্পনার গল্প ছিল না, বরং এক চিরন্তন রাজনৈতিক রূপক। যেমন রাজাকে শেষমেশ মানুষই মগজ ধোলাই যন্ত্রে ফেলে তার পতন ঘটায়, তেমনি আজকের ভারতেও আশা বেঁচে আছে—যে সাধারণ মানুষ, শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম, আর গণআন্দোলনই শেষ পর্যন্ত স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবে।



Comments
Post a Comment