মেঘে ঢাকা তারা : এক নারীর আর্তনাদ থেকে আজকের সংগ্রামের প্রতিধ্বনি

- ইকির মিকির


ঋত্বিক ঘটকের মেঘে ঢাকা তারা শুধুমাত্র একটি সিনেমা নয়—এটি এক যুগের কষ্টের দলিল। বিভাজনের পর ছিন্নমূল হওয়া মানুষের জীবন, বেঁচে থাকার লড়াই, আর অব্যক্ত আর্তনাদের এমন নির্মম রূপ বাংলা চলচ্চিত্রে বিরল। নীতা নামের সেই মেয়েটি আমাদের সবার চোখে এক প্রতীক হয়ে ওঠে—যে চুপচাপ সব সহ্য করে, পরিবারকে বাঁচায়, কিন্তু নিজের স্বপ্নগুলো একে একে বিসর্জন দেয়।

বিভাজনের সময় লাখ লাখ মানুষ পূর্ববাংলা ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসে। এক কাপড়ে ঘর ছেড়ে আসা মানুষদের জন্য শহর তখন ছিল অচেনা, নির্মম। কাজের অভাব, থাকার জায়গার অভাব, আর সামাজিক অবজ্ঞা—সবকিছুর মাঝেও তারা বাঁচার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিল। নীতার চরিত্র সেই অগণিত মানুষের গল্পই বলে, যাদের নাম ইতিহাসের পাতায় নেই, কিন্তু যাদের রক্ত-ঘামে এই শহরের গড়ে ওঠা।

আজও সেই অতীতের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক আবহে NRC ও CAA নিয়ে বিতর্ক নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে সাধারণ মানুষের মনে। নাগরিকত্ব প্রমাণের চাপ, কাগজপত্রের জটিলতা, আর অনিশ্চয়তার ভয়—এই সবই যেন সেই পুরনো বিভাজনের ক্ষতকে আবার উসকে দেয়। যদিও রাজ্য সরকার বলছে, এখানে NRC হবে না, তবুও মানুষের মনে প্রশ্ন থেকে যায়—“আমার ঠিকানা কি আবার বদলে যাবে?”

এই বাস্তবতা মেঘে ঢাকা তারা-র সঙ্গে আশ্চর্যভাবে মিলে যায়। যেমন নীতা নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে কেবল বাঁচিয়ে রাখার জন্য লড়েছিল, তেমনি আজও সাধারণ মানুষ কেবল নিশ্চিন্তে বাঁচতে চায়—কাগজের প্রমাণে নয়, তাদের অস্তিত্বের বাস্তবতায়।

শহরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে যদি এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করি, হয়তো শুনতে পাব নীতার সেই আর্তনাদ—

“দাদা, আমি বাঁচতে চাই…”

এই আর্তনাদ কেবল সিনেমার নয়, এটি আজও আমাদের চারপাশে বেঁচে থাকা সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর।





Comments