দলিত সমাজতত্ত্ব ও মনস্তত্ত্বের এক অনন্য আলেখ্য : দাসকাহিনী
- মানালি মৌলিক
"Those who deny freedom to others, should not expect to be granted freedom for themselves."
|Abraham Lincoln
জাত (Caste) নাকি শ্রেণী (class)? আমাদের সমাজকাঠামো বিশ্লেষণের সাংস্কৃতিক একক কোনটি? এ নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘকালীন। রমেশচন্দ্র শাহের উপন্যাস 'দাসকাহিনী' দুটি একক নিয়েই বিশ্লেষণরত। মূলচরিত্র দলিত ছাত্র কুন্দনের জাতিভেদের গ্লানি বিদেশের নবসমাজে অবগাহন করেও দূর হয় না। উল্টে সেই আন্তর্জাতিকতার সমুদ্রের লবণাক্ততা তাকে আরো একপাক শিকলে জড়িয়ে ধরে। 'স্বাধীনতা' ও 'দাসত্ব' শব্দদুটির ব্যঞ্জনা প্রত্যেক মানুষের কাছে পৃথক আকারের হয়। শুধু বিদেশী রাষ্ট্রের শাসন বা কারো হাত-পা শিকলে বেঁধে রাখলেই তাকে বন্দী করা যায় না, তেমনই মানসিক পরাধীনতা দূরীভূত করাও খুব সহজ কাজ নয়। 'দাসকাহিনী' উপন্যাসটির ছত্রে ছত্রে সমাজ ও ব্যক্তিমানুষের মানসিক আখ্যানের রূপ ফুটে উঠেছে।
◆ অনুবাদ সাহিত্য হিসাবে গুরুত্ব
মূল উপন্যাসটি হিন্দি ভাষায় রচিত। লেখক রমেশচন্দ্র শাহ। বাংলা অনুবাদ করেছেন লেখক অজিত রায়। প্রথমেই বলি,bহিন্দি সাহিত্য সম্পর্কে অনুবাদ পড়া খুবই সীমিত। সুভদ্রাকুমারী চৌহানের নাম আমরা সবাই কমবেশী শুনেছি মাত্র। অনুবাদক উল্লেখ করেছেন, হিন্দি সাহিত্যে মুন্সী প্রেমচাঁদ বা দেওকীনন্দন গোস্বামীর ঘরানার থেকে রমেশচন্দ্র শাহ পৃথক ঘরানার দাবীদার। দাসকাহিনী উপন্যাসটি সমাজব্যবস্থায় জাতিভেদ ও রাজনীতির এক সুনিপুণ আলেখ্য শুধু নয়, বরং মানব মনস্তত্ত্বের বিশ্লেষণধর্মী অন্যস্বাদের রচনা।রমেশ শাহ এক্ষেত্রে জাতি ও শ্রেণী রাজনীতির প্রেক্ষাপটটি যেমন ফুটিয়ে তুলেছেন, তেমনই বাংলাভাষায় এই ৩০০ পাতার উপন্যাসটি পড়তে পাঠককে সুযোগ করে দিয়েছেন অনুবাদক অজিত রায়। কথাগুলি এজন্য বলা যে, দীর্ঘ উপন্যাসে একবারও ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটেনি এবং মনে হয়নি এটি অন্যভাষার অনুবাদ রচনা। সেক্ষেত্রে এই গৌরচন্দ্রিকা অনুবাদককে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করার জন্য আবশ্যিক।
◆ব্যক্তি-সমাজ দ্বন্দ্ব
'দাসকাহিনী' বোঝায় সমাজকে বিশ্লেষণ করতে হলে দৃষ্টির থেকে দৃষ্টিভঙ্গি বেশী গুরুত্বপূর্ণ। এই দৃষ্টিভঙ্গি সমাজের শ্রেণী, জাতপাত, লিঙ্গভেদ, প্রান্তিক, আঞ্চলিকতাভেদে ভিন্ন হতে বাধ্য। আলোচ্য বিষয়টিতে আসার আগে ধান ভানতে এই শিবের গীতটুকু গাওয়া আবশ্যিক ছিলো। গ্রন্থটির মূলচরিত্র কুন্দন তামতা এক অন্ত্যজ-দলিত পরিবারের সন্তান। কিন্তু সমগ্র উপন্যাসটিতে কুন্দনের বাবা নারায়ণ তামতা ও শিক্ষক রাম দত্তের চরিত্রদুটি সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মূল বক্তব্য খুব কম কথায় বলতে গেলে, এক দাসত্বের বন্ধনকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করতে গিয়ে আরেক দাসত্বে জড়িয়ে পড়া। এখানেই কুন্দন ও তার বাবার দৃষ্টিভঙ্গিগত দ্বন্দ্বের সুত্রপাত। কুন্দনের বাবা অকৃত্রিম গান্ধীবাদী। দলিত গ্রামটিতে সমাজসেবার জন্য বিখ্যাত হয়েও তিনি কখনই নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান না। এমনকি কুন্দনের বিত্তবান দাদুর 'হাভেলী'তে গিয়ে তাদের পত্রিকার দায়িত্ব নিতেও অস্বীকার করেন। কারণ পূর্বের সম্পাদক চিরঞ্জীলাল ছিলেন কুন্দনের দাদু 'টামটা সাহেবের' বংশবদ। পত্রিকায় ন্যায্য বক্তব্যের বদলে তিনি টামটা পরিবারের রাজনৈতিক 'লাইন' প্রচার করতেন। তাই স্ত্রী রামীর (কুন্দনের মা) অনুরোধের জবাবে নারায়ণ বিদ্রূপাত্মকভাবে বলেন, "ওনার আরেকজন চিরঞ্জীলাল চাই!"
◆'টামটা'র নির্গলিতার্থ
কুন্দনের ছোটবেলার দারিদ্র্যের ঘোর অন্ধকার আর তার পাঠশালার দৃশ্যের বর্ণনা পাঠকমনকে উদ্বেলিত করে। সেখানে রাম দত্ত মাস্টারের ক্লাসে সহপাঠীরা কুন্দনকে বিদ্রূপে জর্জরিত করে সে 'ডুমৌড়া'- তে(ডোমেদের নিবাস) থাকে বলে। যেখানে দলিত এবং অন্ত্যজ 'টামটা' সম্প্রদায় বাস করে। তাদের জাতপেশা তামার কাজ করা। এই আচরণে কুন্দনকে কাঁদতে দেখে তাকে ধমক লাগিয়ে মাস্টার তার নামের অর্থ জিজ্ঞাসা করেন ও জানান, "কুন্দন মানে খাঁটি সোনা।"
তার জীবনব্যাপী সাধনা ছিলো যেন এই সোনাটুকুই থাকে ও তামাটা খসে পড়ে। দলিত পরিচয়ের গ্লানি যেভাবে কুন্দনকে স্পর্শ করেছিলো তার বাবাকে অনুরূপভাবে স্পর্শ করেনি। এর অর্থ খুঁজে পাওয়ার দুটি দিক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে সঙ্গে ফুটে ওঠে। তা হলো নারায়ণ তামতার মনস্তত্ত্ব, যা অবশ্যই সমাজের নিরিখে গঠিত।
◆ চাঁড়ালরা সব মাতম্ কর!
প্রথমতঃ, নারায়ণ তামতা দলিত হিসাবে নিজেকে দেখেননি ও নিজেকে প্রমাণ করার তীব্রতা অনুভব করেননি। প্রান্তিক গ্রামবাসীর ভরসা হয়েই তিনি দেশের জাতিব্যবস্থাকে প্রথম থেকে গ্রহণ করেছিলেন, বুঝেছিলেন। তাই কুন্দনের পি.এইচ.ডি করতে জার্মানি যাওয়ার সময়ে তাঁর উক্তি, "বিদেশে গিয়ে কী করবে? আগে নিজের দেশটাকে জানুক ভালো করে।"
দ্বিতীয়তঃ, নিজের জীবনেও এই উপদেশকে প্রতিফলিত করতে তিনি ছিলেন তৎপর। নির্বাচন নিয়ে ঝঞ্ঝাটের শেষে প্রকাশ্য জনসভায় তিনি জানিয়ে দেন, প্রার্থী হতে পারবেন না। তখন দীপহীন গৃহে কুন্দনের মা ও তাকে নিদ্রিত দেখে অবাক হন ও জানতে পারেন সেদিন রান্না হয়নি। রামী তাঁর এই 'হাতের লক্ষী পায়ে ঠেলা'য় বিরক্ত হয়ে মৃতদের বাড়ির মতো উনুন জ্বালাতে অস্বীকার করেন। অথচ, নারায়ণ বুঝেছিলেন তাঁকে নির্বাচনে দাঁড় করানো একটা প্রহসনমাত্র। কারণ তিনি দলিত প্রার্থী। জিতলে দলিত নেতা হিসাবে তাঁর পরিচয় লাভ ঘটবে ঠিকই, তবে জনসমাজ থেকে তিনি ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন। তাই সেইরাতে ক্রুদ্ধ অভিমানে তিনি বাড়ি ছেড়ে নিজের অদেখা দেশটাকে দেখতে চলে যান। বেরিয়ে যাবার আগে বলেন -- "চাঁড়ালরা সব মাতম্ কর!"
এখানে বাক্যটি গ্রাম্য ও রূঢ় মনে হলেও, স্বল্পশিক্ষিত নারায়ণ রাজনীতির অঙ্কে তাঁর দলিত পরিচয়ের সাংখ্যমানটা বুঝে গিয়েছিলেন।
◆ আলোর পথে যাত্রা
বাবাকে যেসময়টা কুন্দনের সর্বাধিক প্রয়োজন ছিলো, তখনই ঘটে এই বিপর্যয়। তার স্কুলের শেষ পরীক্ষা ও কলেজ-জীবনের শুরুর সন্ধিক্ষণে এই ঘটনা বাবার সঙ্গে তার ব্যবধান আরো বাড়ায়। তবে তাতে অসামান্য মেধাবী এই ছাত্রটির আলোর পথযাত্রা আটকায়নি। এইপর্বে কুন্দনের মামাবাড়ির চরিত্রগুলি স্পষ্টতর হয়। দাদু টামটা সাহেব, যিনি স্বঘোষিত গান্ধীবাদী ও ধনী দলিত নেতা। নিজের আত্মবিজ্ঞপ্তি ও প্রতিপত্তি সর্বদাই তাঁবেদারের দেহরূপ ধরে তাঁর বৈঠকখানা ঘিরে থাকে। নারায়ণ একে প্রাসঙ্গিকভাবে বলেছেন, 'থিয়েটার'। কুন্দনের মামা সুরেন (যিনি আচার্য নরেন্দ্র দেব ও জয়প্রকাশ নারায়ণের সোশ্যালিস্ট পার্টির সদস্য), জগদীশ ( কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য) যারা সকলেই তাদের বাবা টামটা সাহেবের বদান্যতায় নির্বাচনের টিকিট পেয়ে থাকেন। এইপর্বের রাজনৈতিক বিতর্কগুলি তীক্ষ্ণ হাস্যরস ও তথ্যে সমৃদ্ধ ধ্রুব সত্যের সমন্বয়।
◆ নৃতত্ত্ব ও কাহিনীর সংযোগ
চমকপ্রদ বিষয়টি হলো, কুন্দন বা ভবিষ্যতের প্রফেসর কে.এল. টামটার বিষয় ছিলো নৃতত্ত্ব (anthropology)।
স্বভাবতই বলা হয়, ভারতবর্ষ হচ্ছে নৃতত্ত্ব ও পুরাতত্ত্বের জাদুঘর। কোল, সাঁওতাল, ভিল, মুন্ডা ইত্যাদি আদিম জনজাতির সন্ধানে গভীর অধ্যয়ন করে কুন্দন। একদা ভদ্রসমাজে অস্পৃশ্য এইসব আদিম জনজাতির প্রত্নপ্রাচীন তথ্যরাশির মধ্যে জীবন্ত কুন্দন তার দলিত পরিচয় নিয় সসম্মানে বিদ্যমান। অথচ নিজের গোষ্ঠী পরিচয়ের জন্য সেও একদা ছিলো উচ্চবর্ণের দ্বারা নিপীড়িত।
◆ প্রেম- অপ্রেম
জার্মানিতে কুন্দনের অধ্যাপকের কন্যা এলিস যখন প্রবল আগ্রহ সহকারে ভারতবর্ষে আসতে চায় ও ধর্ম-প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে গভীর জ্ঞানলাভ করতে চায়, কুন্দনের ব্যাগ্রতা ছিলো তার দ্বিগুণ। তার অধ্যাপক সর্তকতা জানান,
--" তোমাদের সমাজে কিন্তু আন্তর্জাতিক বিয়েটা এখনো গ্রহণযোগ্য নয়।"
কিন্তু কুন্দনের উচ্চাশার পথে সর্বশেষ ধাপটি ছিলো এলিসকে বিবাহ। এটিও জটিল মনস্তত্ত্বের বিষয়। মাস্টার রাম দত্তের কন্যা ভাগীরথীর প্রতি বিকশিত হয়েছিলো কুন্দনের প্রথম প্রেম। এখানেও 'তেপান্তরের ব্যবধান' সেই জাতিভেদ। ব্রাহ্মণকন্যা ভাগীরথীকে বিবাহ করা কুন্দনের অপরাধ হবে -- এটা স্বয়ং তার বাবার মত। সেই ক্ষোভে আন্তর্জাতিকতা পেরিয়ে, বিদেশী, অতি উচ্চশিক্ষিতা ও খ্রিষ্টান কন্যা এলিসকে বিবাহ করা তার দরকার ছিলো। এটা হয়তো ছিলো সমাজের মুখে নিজের সাফল্যের একটি ঝকঝকে স্মারক ছুঁড়ে মারার সামিল। কিন্তু ভারতে এসে এক পাদ্রীর দ্বারা সেই সম্পর্কও ভেঙে যায়।
পরিশেষে, নিজের ভারতবর্ষের অগণিত সমস্যার মধ্যে স্থিতপ্রজ্ঞ হয়ে নিজেকে আবিষ্কার করার চেষ্টায় কুন্দন নিমজ্জিত হয়। বাবার গান্ধীবাদেই পায় শেষ সত্যের সন্ধান। সে যাই হোক, জাতিব্যবস্থার এক অনন্য দলিল এই উপন্যাসটি। যার পরতে পরতে জাত ও শ্রেণীর দ্বিমুখী দ্বন্দ্বের বাস্তবচিত্র। যার কুফল এই দলিত ছাত্রকে প্রান্ত থেকে প্রান্তরে ছুটে বেড়াতে বাধ্য করে আত্মপ্রতিষ্ঠার সন্ধানে। অথচ কোনো সাফল্যই তার জন্য যথেষ্ট হয় না। কেবল নিজেকে ঘিরে দাসত্বের পাকে পাকে সে শৃঙ্খলিত হয়ে পড়ে। যেভাবে নৃতত্ত্বের মূলসুর নিহিত রয়েছে আদিম জনজাতির মধ্যে, যারা জমিদার ও জোতদার কর্তৃক নির্যাতিত হয়েছিল। তারা পিষ্ট হয়েছিলো ব্রাহ্মণ্যবাদ ও জাতিভেদের জাঁতাকলে ও শেষে খুঁজে নিয়েছিলো খ্রিষ্টান মিশনারীদের আশ্রয়। ঝকঝকে মিশনারী স্কুল ও প্রার্থনাগৃহের আড়ম্বর যেমন অভিভাবকদের আকর্ষণ করে, তেমনই কুন্দন ভেবেছিলো ইউরোপীয় সভ্যতার ছাপ তামার ধূসরতা মুছিয়ে দিতে পারে। ইতিমধ্যে দেশ পরিক্রমা করে বাবা তাকে কিছু চিঠি দেন ও দ্রুতই মারা যান। কুন্দন শেষসময়ে তার বাবার শয্যাস্পার্শে না থেকেও চিন্তাধারাকে গ্রহণ করে।তাই ক্রমশ হতাশায় নিমজ্জিত হতে হতেও সে খুঁজে পায় তার যাপনের মূলসুর তার মাতৃভূমিতেই গ্রন্থিত। সম্পূর্ণ উপন্যাসটি গভীর অধ্যয়নে সমাজতত্ত্বের বিশ্লেষণে মনোযোগ দিয়েছে। তাই মানসিকভাবে বিধ্বস্ত কুন্দন শেষপর্যন্ত শান্তির আস্বাদ খুঁজে পেয়ে যেন সার্থক করে বিশ্বকবির সেই কথাগুলি,
-- "মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক / আমি তোমাদেরই লোক / আর কিছু নয়।"

Comments
Post a Comment